‘ভূতের গলি’ ধানমন্ডিতে! সে রকমই দেখা গেল। বড় বড় সুদৃশ্য অক্ষরে স্পষ্ট করে লেখা। কালো কাপড়ের ওপরে সাদা এমব্রয়ডারির অক্ষর। গলিটির আবহও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে চমৎকার সূচিকর্মে। সড়কবাতি জ্বলছে। ওপর দিয়ে আড়াআড়িভাবে ঝুলছে তারের জটিল জঞ্জাল। দুই পাশে সারিবদ্ধ দরদালানের আভাস। নিচে একচিলতে ইতিহাসচর্চাও আছে। সেখানে এলিফ্যান্ট রোডের হাতিরপুল এলাকার এই বিখ্যাত গলিটির নামকরণের বিবরণ। সূচিকর্মের এই ‘ভূতের গলি’ এখন প্রদর্শিত হচ্ছে ধানমন্ডির ২৭ নম্বর সড়কের বেঙ্গল শিল্পালয়ের প্রথম তলার প্রদর্শনকক্ষে।
গতকাল শনিবার থেকে বেঙ্গল শিল্পালয়ে শুরু হয়েছে ‘বিয়ন্ড দ্য ব্রিফ’ নামের দলবদ্ধ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। সেখানেই রয়েছে শিল্পী মিতা মেহেদীর এই ‘ভূতের গলি’। এটি ছাড়াও তিনি ‘কলাবাগান’ ও ‘কাঁটাবন’ নামের দুই শিল্পকর্ম রেখেছেন পাশাপাশি।
বৃত্ত আর্ট ট্রাস্ট ও বেঙ্গল শিল্পালয় যৌথভাবে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে। ঢাকায় স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল সিস্তিয়াগা প্রধান অতিথি হিসেবে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আসার আগে এখানকার তৈরি পোশাকশিল্প সম্পর্কে তিনি জানতেন। এখানে এসে তিনি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বিশেষ করে সংগীত, চিত্রকলা—এসব সম্পর্কে জানতে পেরেছেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, এস এম সুলতানের মতো মাস্টার আর্টিস্টদের কাজের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছে এবং তিনি মুগ্ধ। এই প্রদর্শনীতে সমকালীন শিল্পীদের ব্যতিক্রমী কাজগুলো দেখে তিনি আনন্দিত হয়েছেন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রদর্শনীর শিল্পকর্ম নিয়ে আলোচনা করেন অধ্যাপক শিল্পী ঢালী আল মামুন। তিনি বলেন, এটি একটি ব্যতিক্রমী প্রদর্শনী। যাঁরা বাণিজ্যিক গ্রাফিক ডিজাইন নিয়ে কাজ করেন, সেই শিল্পীরা অন্য রকমের কাজ নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, শিল্পের প্রধান একটি উদ্দেশ্য যোগাযোগ তৈরি করা। বাণিজ্যিক শিল্পও ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে। বর্তমান সময়ে শিল্পকলা সম্পর্কে প্রথাগত ভাবনার পরিবর্তন হয়েছে। ‘শুদ্ধ শিল্প’ তার সীমানায় আবদ্ধ নেই। সীমা অতিক্রম করে একটি নতুন শিল্পভাষার জন্ম দিয়েছে। সমকালীন শিল্পীরা সেই নতুন শিল্পভাষায় কাজ করেছেন।
প্রদর্শনীটির তত্ত্বাবধায়ক শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান এর প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। স্বাগত বক্তব্য দেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। প্রদর্শনী চলবে আগামী ৮ আগস্ট পর্যন্ত। প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
প্রদর্শনীতে ১০ জন শিল্পীর বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পকর্ম রয়েছে। অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা প্রত্যেকেই দেশের অন্যতম প্রধান বিজ্ঞাপনী সংস্থা বা গ্রাফিক ডিজাইন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। তাঁরা হলেন ইমরান হোসেন পপলু, মনির মৃত্তিক, আলী সাগর, শেখর শাশ্বত, পীযূষ তালুকদার, মাহবুবুর রহমান, সনদ কুমার বিশ্বাস, মিতা মেহেদী, মেহেদী হাসান ও শিমুল দত্ত।
এই প্রদর্শনীতে ১০ জন শিল্পী তাঁদের নিজেদের বাণিজ্যিক ধারার কাজগুলোর ভেতর থেকেই নিজ নিজ শিল্পভাবনাকে নতুন আঙ্গিকে এই প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করেছেন।মাহ্বুবুর রহমান, শিল্পী ও প্রদর্শনীটির তত্ত্বাবধায়ক
প্রদর্শনী সম্পর্কে তত্ত্বাবধায়ক শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছরের শেষ নাগাদ তাঁরা জুরিখ ভ্রমণ করেন। সেখানে শিল্পকলার গ্যালারিগুলোতে গ্রাফিক ডিজাইনের বিভিন্ন ধরনের কাজ দেখেন। টাইপোগ্রাফি, পোস্টার, সাইনবোর্ডসহ অনেক রকমের কাজ ছিল সেখানে। এসব তাঁদের খুবই অনুপ্রাণিত করে। বিষয়টি নিয়ে তাঁরা পরে গভীরভাবে ভেবেছেন। আমাদের দেশসহ পৃথিবীর প্রায় সর্বত্রই আর্ট কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক চারুকলা শিক্ষার পরে অনেকের পক্ষেই শুধু শুদ্ধ শিল্পকলার চর্চা করা সম্ভব হয় না। জীবন–জীবিকার প্রয়োজনে তাঁরা বিজ্ঞাপনী সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। কিন্তু তাঁদের অন্তরের সৃজনশীলতা, শিল্পসৃজনের আকাঙ্ক্ষা নিঃশেষিত হয় না। তাঁদের সেই শিল্পানুরাগ তাঁরা বিভিন্ন মাধ্যমের কাজে প্রকাশ করেন। বিজ্ঞাপনী শিল্প তখন তার সীমা ছাড়িয়ে শুদ্ধ শিল্পের সঙ্গে মিশে যেতে চায়। এই প্রদর্শনীতে ১০ জন শিল্পী তাঁদের নিজেদের বাণিজ্যিক ধারার কাজগুলোর ভেতর থেকেই নিজ নিজ শিল্পভাবনাকে নতুন আঙ্গিকে এই প্রদর্শনীতে উপস্থাপন করেছেন।’
এই প্রদর্শনীতে স্থাপনা, ভিডিও চিত্র, টাইপোগ্রাফি, ট্যাপেস্ট্রি, সূচিকর্ম, কোলাজ, মিশ্র মাধ্যমসহ অনেক রকম মাধ্যমের কাজ রয়েছে। কাজের এই বৈচিত্র্য ও বর্ণাঢ্যতা প্রদর্শনীটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। কোনো পণ্যের বিজ্ঞাপন বা প্রচারপত্রের কথাগুলো লিখতে গিয়ে অনেক সময়ই লেখার মধ্যে ভুল হয়ে যায়। তখন সেই ভুল শব্দ বা ভুল বানান একটা অন্য রকম অর্থময়তা সৃষ্টি করে। কাজের এই ভুলভাল নিয়ে শব্দের খেলা করেছেন ইমরান হোসেন। অনেক রঙের বড় বড় অক্ষর সাজিয়ে ভুলকে ফুলের মতো বর্ণাঢ্য করে তুলেছেন তিনি।
এখন বড় বড় মুদিখানায় যেমন প্যাকেটে করে কাটাকুটি করা মুরগি, মাছ ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে তেমনি করে পলিথিনের স্বচ্ছ প্যাকেটে করে কান, নাক, আঙুল, চোখ—এসব সাজিয়ে রেখেছেন মাহবুবুর রহমান তাঁর ‘নেট ওয়েট’ নামের কাজে। স্বচ্ছ রেজিনে তৈরি এসব নাক-কানের প্যাকেটে ওজন, উপাদান, মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখসহ বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ আছে, যেমন বাজারের পণ্যে থাকে।
আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এখন প্রতিটি পর্যায়, প্রতিটি দিন, কীভাবে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রভাববলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে, সেটাই দেখিয়েছেন শিমুল দত্ত তাঁর বিশালাকার স্থাপনাকর্মে। থার্মাকল ব্যবহার করে তিনি তৈরি করেছেন ডিম, চাল, ওষুধ এমন নানা সামগ্রী। কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠান এসব সরবরাহ করছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে।
‘গুজবের কান’ নামের মিশ্র মাধ্যমের কাজটি করেছেন পীযূষ তালুকদার। ‘কান নিয়েছে চিলে’ এবং আরও কিছু শব্দ আছে, যা ঝাপসা হয়ে গেছে। প্রকৃত মর্মার্থ বোঝা যাচ্ছে না। এমন লেখার মাঝখানে বিশালাকার একটি কান। রঙিন সুতো ঝুলছে তার ভেতর থেকে।
মেহেদী হাসান করেছেন চামড়ার ওপর এমব্রয়ডারি ও ধাতব পাতের কাজ। তিনটি আলাদা কাজের এই গুচ্ছটিতে তিনি যুদ্ধ, শিশু নির্যাতন ও পশুদের ওপর হিংসাত্মক আচরণের বিষয় তুলে এনেছেন।
মনির মৃত্তিক প্রদর্শনী কক্ষের মেঝেতে করেছেন ‘উন্নয়ন’ নামের একটি স্থাপনাকর্ম। নকশিকাঁথার মতো সূচিকর্মের বিশাল পটভূমিতে শহরের রাস্তা, খাল, নদী এসব ফুটিয়ে তোলা। তার ওপরে ছোট ছোট ইট দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ভবন, সেতু, প্রাচীর। বিপন্ন গাছপালা আর বিপর্যস্ত প্রকৃতির বিষয়টিও উঠে এসেছে এই আগ্রাসী নগরায়ণের চিত্রকল্পে। এভাবেই শিল্পীরা তাঁদের নিজেদের ভাবনা নিয়ে আলাদা আলাদা কাজ করেছেন।
এ ছাড়া শিল্পীরা সবাই মিলে প্রায় ৬৫ ফুট লম্বা ও ১২ ফুট উচ্চতার একটি বিশাল কাজ করেছেন কক্ষের দক্ষিণ দিকের দেয়ালজুড়ে। শিল্পীরা জানালেন, পুরান ঢাকায় পণ্যের মোড়ক তৈরির কারখানাগুলোতে অনেক রকম পণ্যের প্যাকেট তৈরি হয়। পলিথিন, কাগজ, কাপড়সহ অনেক রকমের মাধ্যমে এসব মোড়ক বা প্যাকেট তারা তৈরি ও মুদ্রণ করে। সেই মোড়কগুলো নিয়েই দেয়ালজুড়ে কোলাজের নকশা করেছেন শিল্পীরা। সেখানে মানুষের অবয়ব আছে অনেক ভঙ্গিতে। আছে অনেক ধরনের প্রাণী ও পাখি, গাছ লতাপাতার আদল। পণ্য সংস্কৃতি আর জীবনযাপন কীভাবে একাকার হয়ে গেছে—এই বর্ণবহুল নান্দনিক উপস্থাপনার মাধ্যমে শিল্পীরা দেখিয়ে দিলেন দর্শকদের।
আপনার তথ্য জমা দেওয়ার পর আমাদের প্রতিনিধি দ্রুত আপনার সাথে যোগাযোগ করে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় আপনাকে সহায়তা করবেন।